কালীগঞ্জটপ লিড

৫৩ দখলদারের হাতে ঝিনাইদহ বুড়ি ভৈরব নদের মৃত্যু

আসিফ ইকবাল কাজল

ঝিনাইদহের বুড়ি ভৈরব নদ এক সময় জাহাজ চলত। খরশ্রোত আর কলকল পানির ধ্বনীতে নদীপাড়ের মানুষ বিমোহিত হতো। অথচ সেই প্রমত্তা নদ এখন মরা খাল। নদের কোন চিহ্ন রাখেনি দখলদারেরা।

ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলায় বুড়ি ভৈরব নদটি ৫৩ জন দখলদার গিলে খেয়েছে। তারা নদের জায়গায় শতাধিক পুকুর কেটেছেন, স্থাপনা তৈরী করেছেন। স্থানীয় ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তারা ওই ৫৩ জনের তালিকা তৈরি করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে দিয়েছেন। কিন্তু কোন কাজে আসেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে এই বুড়ি ভৈরব নদ। কালীগঞ্জের মর্জাদ বাঁওড়ের স্লুইচগেট থেকে শুরু হয়ে গৌরিনাথপুর, নিত্যানন্দী, ঘোপপাড়া, সাতগাছিয়া, মাসিলা, ফুলবাড়ি, ঝনঝনিয়া হয়ে নদটি যশোরের নওয়াপাড়ায় ভৈরব নদে মিলেছে। কালীগঞ্জ অংশে নদটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১০ কিলোমিটার।

স্থানীয় কাষ্টভাঙ্গা ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, বুড়ি ভৈরব নদটির কালীগঞ্জ অংশের তিন শতাধিক একর জমি দখল করে নিয়েছেন স্থানীয় ৫৩ জন প্রভাবশালী। ফলে ১৭০ ফুট প্রস্থের নদটি এখন ৪০ ফুটে নেমে এসেছে। দখলদারের মধ্যে রাজনৈতিক নেতা ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা থাকায় প্রশাসন কিছুই করতে পারছেন না। নদটির যেদিকে চোখ যায় শুধু পুকুর আর পুকুর। কালীগঞ্জের ওই তিনটি মৌজায় নদে শতাধিক পুকুর রয়েছে। একেকটি পুকুরের আয়তন এক থেকে ছয় একর। অনেক স্থানে ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। ঘরবাড়ি আর পুকুরের মাঝে সামান্য একটু জলধারা রয়েছে। সেটাও এমনভাবে ঘিরে ফেলা হয়েছে, বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই এটা একটা নদ। সেই সঙ্গে ওই জলাশয়ের ভেতরেও চাষাবাদ শুরু করেছেন দখলদাররা।

সাতগাছিয়া গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা ছিদ্দিকুর রহমান (৬৫) বললেন, ৩০-৪০ বছর আগেও বুড়ি ভৈরবে প্রচুর পানি থাকত। এলাকার লোকজন বর্ষার সময় নদে মাছ ধরতেন। এক সময় জাহাজ চলত। জাহাজ এসে থামত বারোবাজার এলাকার ঘাটে। সেই জায়গাটিকে এখনো সবাই জাহাজঘাটা নামেই চেনে।

তিনি জানান, দুই যুগ আগে নদের দুই পাড়ে কিছু চর জাগে। তখন এলাকার এক শ্রেণির মানুষ চরের জমি দখল শুরু করেন। প্রথমে বন্দোবস্ত ও পরে নিজেরাই নদের জমি দখল করেন। মূলত ওই বন্দোবস্ত দেওয়ার পর থেকে নদের বারোটা বাজতে শুরু করে।

দখলকারীদের একজন ঘোপ গ্রামের তরিকুল ইসলাম। তাঁদের পরিবারের দখলে রয়েছে চার একর জমি। এ জমিতে তাঁরা ছয়টি পুকুর কেটেছেন। তরিকুল ইসলাম বলেন, তাঁরা ভূমিহীনদের কাছ থেকে জমি কিনে সেখানে পুকুর কেটেছেন। জমির শ্রেণি পরিবর্তন বা রেকর্ড দেওয়া সবই করছেন সরকারি কর্মকর্তারা। তাঁরা এগুলো না করলে জমি কেনাবেচা হতো না।

কাষ্টভাঙ্গা ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয় সূত্রে জানা গেল, কালীগঞ্জ উপজেলার তিনটি মৌজায় থাকা নদটির প্রায় ৩০০ একর জমির মধ্যে ১৯৮৯-৯০ সালে ৬৬ একর জমি ৬০ জন ভূমিহীনকে বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। মূলত চাষের জন্য বন্দোবস্ত দেওয়া হয়। তাঁদের ১৩টি শর্ত দেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শর্ত ছিল জমির শ্রেণি পরিবর্তন না কর।

এছাড়া ওই জমিতে পুকুর করা যাবে না, স্থাপনা গড়ে তোলা যাবে না, বর্গা দেওয়া যাবে না এবং বিক্রি করা যাবে না মর্মে উল্লেখ ছিল। কিন্তু এসব শর্তের কোনোটিই মানা হয়নি না। দখলদারদের একজন সাদিকপুর গ্রামের বজলুর রহমান।

তিনি বলেন, তাঁর থাকার জায়গা ছিল না। এ কারণে নদীর জমিতে বাড়ি তৈরি করেছেন। তবে তিনি একা নন, এলাকার অনেকে এভাবে নদীর জমি দখল করছেন।

ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের তালিকা মোতাবেক, দখলদারদের মধ্যে আরও রয়েছেন গৌরিনাথপুর গ্রামের শহিদুল ইসলাম (১ একর ৫০ শতক) ও হেদায়েত উল্লাহ (৩ একর) ও বেলাট গ্রামের স্বপন বিশ্বাস (২ একর ৩০ শতক)।

কাষ্টভাঙ্গা ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বলেন, বন্দোবস্ত পাওয়া ভূমিহীনদের বেশির ভাগই শর্তগুলো ভঙ্গ করেছেন। মাত্র পাঁচ-ছয়জন ছাড়া অন্য ভূমিহীনেরা তাঁদের জমি প্রভাবশালীদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। আমরা এ সব কথা উপরে জানিয়েছি। কিন্তু কোন কাজে আসেনি।

কালীগঞ্জের সহকারী কমিশনার ভুমি পদটি শুন্য থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

Related Articles

২ Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button