স্ম র ণ : ঝিনাইদহের শহীদ সাংবাদিক শেখ হাবিবুর রহমান

ঝিনাইদহের চোখঃ
১৯৭১ সালের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের রক্তঝরা ৯ মে আমরা হারিয়েছি আমাদের একজন কলম সৈনিককে। নির্ভীক সাংবাদিক শহীদ শেখ হাবিবুর রহমান ১৯২০ সালের ২১ জুলাই বাগেরহাট জেলার বাদেখাড়া (ফুলতলা) গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে কর্মসূত্রে ঝিনাইদহে এসে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হন। শেখ হাবিবুর রহমানের দুই ছেলেও সাংবাদিক।
বড় ছেলে শেখ মিজানুর রহমান ১৯৬৮ সাল থেকে দৈনিক জনবার্তা ও দৈনিক আজাদের ঝিনাইদহ সাংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেছেন। বর্তমানে ঝিনাইদহের সাপ্তাহিক ‘চলন্তিকা’ পত্রিকার সম্পাদক। ছোট ছেলে শেখ ওয়াশিকুর রহমান অগ্রণী ব্যাংকের এজিএম হিসেবে অবসর গ্রহণ করে বড় ভাইয়ের পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক। দেশ স্বাধীনতার আগে হলিডে এবং এনা বার্তা সংস্থায়ও কর্মরত ছিলেন ঝিনাইদহ প্রতিনিধি হিসেবে।
শেখ হাবিবুর রহমান লেখাপড়া শেষে আনসার বাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট পদে ঝিনাইদহ মহকুমায় যোগদান করেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত তেজস্বী ও স্বাধীনচেতা। ফলে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন। ঝিনাইদহ শহরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। পেশা হিসেবে প্রথমে বেছে নেন আইন পেশা। ১৯৫০ সালে তিনি আইন পেশার পাশাপাশি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সংবাদদাতা হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। কেননা সাংবাদিকতার প্রতি ছিল তার অবিচল আস্থা ও গভীর মমত্ববোধ।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের আগে ঝিনাইদহ শহরে সব মহলে সাংবাদিক বলতে একনামে সবাই চিনতেন শেখ হাবিবুরকে। ১৯৭১ সাল পর্যন্ত প্রায় ২১ বছর দৈনিক আজাদ পত্রিকায় ঝিনাইদহবাসীর বিভিন্ন সমস্যার কথা লেখনীর মাধ্যমে প্রতিনিয়ত তুলে ধরেছেন। ওই সময়ে কিছু দুর্নীতিপরায়ণ চেয়ারম্যান, আমলা, কর্মচারীদের বিভিন্ন দুর্নীতির খবর ছাপা হলে তিনি বিরাগভাজন হন। ফলে বিভিন্ন সময়ে হুমকির মোকাবেলা করতে হয়েছে তাকে একাই। তিনি রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজের নীতিতে সব সময় অটল ছিলেন। সত্য কথা বলা ও লেখাই হয়েছিল তার জীবনের কাল। তিনি সাংবাদিকতাকে একটি মহান পবিত্র সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে পালন করতেন। নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে ছিলেন অটল। স্পষ্ট হক কথা বলতে কখনো পিছপা হননি। অন্যায় আবদার, লোভ লালসা কখনো তাকে স্পর্শ করতে পারেনি।
অন্যায়ের কাছে মাথানত করা বা আপস করা ছিল তার নীতিবিরুদ্ধ। ষাটের দশক থেকে সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত সাংবাদিক সমিতির অফিস ও প্রেস ক্লাব ছিল যশোর দড়াটানা। সেখানে সাংবাদিকদের সব সভা-সমাবেশে তিনি ঝিনাইদহ থেকে সঠিক সময়ে যোগদান করতেন। ছিলেন খুবই সহজ-সরল। সদালাপী, হাসি-খুশি, দরাজ দিলের অধিকারী।
মক্কেলদের সাথেও তিনি সব সময় অমায়িক আচরণ করতেন। মনে কষ্ট দিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে অনৈতিক উপার্জনের কথা কখনো ভাবেননি। অনেক ক্ষেত্রে গরিব মক্কেলদের তিনি বিনা পয়সায় আইনি সহায়তাও দিয়েছেন।
১৯৭১ সালের এই দিনে মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা সাংবাদিক হাবিবুর রহমানকে গভীর রাতে বাসভবন থেকে তুলে নিয়ে যায়। শহর থেকে ৭ কিলোমিটার দূরে যশোর-ঝিনাইদহ সড়কের তেঁতুলতলায় বুলেটের আঘাতে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় তাকে।
এই প্রজন্মের সাংবাদিকদের কাছে প্রত্যাশা, যারা বয়সের ভারে সাংবাদিকতা থেকে অবসর নিয়েছেন এবং যেসব সাংবাদিক আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন, মহান স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, তাদের অসমাপ্ত কর্ম সম্পন্ন করাই হবে প্রধান কাজ।
অধ্যাপক মো: মসিউল আযম
প্রবীণ সাংবাদিক